অনুপ্রেরণার একটি নক্ষত্র শিক্ষকতায় এক নতুন দৃষ্টান্ত

বছর দুই আগে শাকিলকে নিয়ে আমি পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন করেছিলাম। ২০১৪ সালে মাশুন্দিয়া কলেজে যোগদানের পর শাকিলের সাথে আমার পরিচয় হয়। তখন জানতে পারি- সে রসায়নে অনার্স পড়ছে। কলেজের পাশেই ওদের বাড়ি। আর কলেজ গেটেই ওদের চায়ের ছোট্ট একটি দোকান। ওকে চায়ের দোকানে চা বিক্রি করতে দেখে প্রথমের দিকে আমিও অবাক হয়েছিলাম।
পরিচয়ের সূত্র ধরে ওদের দোকানের বেঞ্চিতে বসে মাঝেমধ্যেই সহকর্মীদের সাথে চায়ের আড্ডা দিতাম। পরবর্তীতে বছর দুই আগে একদিন হঠাৎ শাকিলকে বললাম- তুমি কিন্তু সমাজের অন্য দশ জন বেকার তরুণের অনুপ্রেরণা হতে পারো…। শাকিল বলেছিল, কিভাবে? আমি বললাম, তোমার যদি আপত্তি না থাকে তবে তোমাকে নিয়ে পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন করতে চাই। বলামাত্রই শাকিল সানন্দে সম্মতি জানালো। আমি ওর চা বিক্রিরত ছবি তুললাম, ওর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করলাম; ৩-৪ দিন পরেই আমাদের  প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো- অনুপ্রেরণার প্রতিক বেড়ার শাকিল। বেড়া থেকে প্রথম আলোর প্রতিনিধি আমার অগ্রজ বরুণ রায় (দাদা) আমার কাছ থেকে শাকিলের ফোন নম্বর নিয়ে কথা বলে প্রথম আলোতেও একটি প্রতিবেদন করলেন।
বস্তুত কোনো কাজই ছোট নয়। যে কোনো কাজকে বড় করে দেখার মানসিকতা আমাদের নেই- এটাই আমাদের বেকারত্ব সমস্যার অন্যতম কারণ, এটাই আমাদের দীনতার একমাত্র কারণ। রসায়ন শাস্ত্রে অনার্সসহ মাস্টার্স সম্পন্ন করা তৌহিদুল ইসলাম শাকিল এমনটাই মনে করে। তাই তো সে লেখাপড়া শেষ করে একদিনও বেকার না থেকে বাবার চায়ের দোকানে কাজ করে; চা বানিয়ে নিজেই পরিবেশন করে থাকে। চায়ের দোকানদারীর পাশাপাশি সে টিউশনীও করে। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। এভাবেই এনটিআরসিএ কর্তৃক শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হয় শাকিল।
ওকে নিয়ে প্রতিবেদনটি যখন লিখি, তখন প্রশ্ন করলে সে জবাব দিয়েছিল, স্কুল-কলেজে শিক্ষকতা করার স্বপ্ন নিয়েই আমি আমার সাধ্যমতো পড়াশুনা করছি, প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি- চাকরি আমার একদিন হবেই। কিন্ত চাকরি না হওয়া পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যও অলস সময় কাটাতে চাই না। তাই সকাল-বিকেলে বাবার চায়ের দোকানে কাজ করি।
পাবনার বেড়া উপজেলার মাশুমদিয়া কলেজ বাজারে চায়ের দোকান রয়েছে তৌহিদুল ইসলাম শাকিলের বাবার। তার বাবা মজিদ মোল্লা একসময় পরিবহন শ্রমিকের কাজ করতেন। প্রায় ১৩ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন তিনি। সংসার চালাতে তিনি কলেজ বাজারে ছোট একটি চায়ের দোকান দেন। শাকিল তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। ওই সময় থেকেই সে বাবাকে চায়ের দোকান চালাতে সাহায্য করে আসছিলো। একদিকে বাবার সঙ্গে চায়ের দোকান চালানো, অন্যদিকে পড়াশোনা। এভাবেই সে বিজ্ঞান বিভাগে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করে। এরপর রসায়ন শাস্ত্রে বিএসসি সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হয় পাবনার সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে। সেখানে পড়াশোনা করার ফাঁকে বাবার সঙ্গে চায়ের দোকানটি সে চালিয়ে গেছে। অনার্স পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার পর শাকিল চায়ের দোকানে কাজের সময় আরও বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি সে টিউশনীও করতে থাকে। আর টিউশনী করতে গিয়েই সে নিজের ভেতর আবিষ্কার করে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন।
গতকাল (১৫ জুলাই) রাতে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) বাংলাদেশে বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগের ফল প্রকাশ করে। ওই ফলাফল অনুযায়ী- শাকিল বেড়া উপজেলার আমিনপুর আয়েনউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে ভৌতবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়। তার এই নিয়োগপ্রাপ্তির খবর জানাজানি হলে রাতেই স্থানীয় শুভাকাঙ্ক্ষিদের নানাবিধ মন্তব্যে প্রশংসিত হয় শাকিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শাকিলকে নিয়ে পাঁচ শতাধিক মানুষের অভিনন্দন বার্তায় শাকিল উচ্ছ্বসিত।
মনে কতটুকু জোর থাকলে স্পষ্টভাষায় বলা যায়, শিক্ষক তো আমি একদিন হবোই- কিন্তু চাকরী না হওয়া পর্যন্ত বেকারসময় কাটাতে চাই না একদিনও; তাই চায়ের দোকানে কাজ করছি।
শাকিল বলে, একসময় কেউ কেউ আমার চা বানিয়ে বিক্রি করার বিষয়টি বাঁকা চোখে দেখতেন। কিন্তু এখন অনেকেই বাহবা দেন। একদিকে আমি টিউশনী করেছি, অন্যদিকে চায়ের দোকানটিও চালিয়েছি। আমার কাছে দুটি কাজই সম্মানজনক। এখন স্কুলে স্থায়ী চাকরির সুযোগ পেলাম- এটিই হবে আমার একমাত্র পেশা। তার মতে, কাজ না করে বেকার বসে থাকাটা শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার জন্যই অসম্মানের।
আমিনপুর থানার প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের কাছে শাকিল এখন অনুপ্রেরণার প্রতিক। শাকিলরা তিন ভাই-বোন। অন্য দুই ভাই-বোনও পাবনার সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
শাকিল সব ধরনের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠা অসম্ভব পরিশ্রমী এক তরুণ। কোনো কাজই যে ছোট নয়, তা সে প্রমাণ করে দিয়েছে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকার তরুণদের জন্য সে অবশ্যই অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। কিছু সময়ের জন্য হলেও শাকিল কাজকে ভালোবেসে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা এলাকার শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকার-যুবকদের জন্য অনুকরণীয়-অনুসরণীয় হয়ে থাকলো। জয় হোক শাকিলের, জয় হোক পদার্থের।