এলডিসি থেকে উত্তরণ যত চ্যালেঞ্জ উত্তরণের পর

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশের নাম সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। এর ফলে ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে পুরোপুরি বের হয়ে যাবে বাংলাদেশ। গত শুক্রবার রাতে এই সুখবর আসে। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সংবাদ সম্মেলনও করেছেন।

কিন্তু এই উত্তরণের সুবাদে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে মর্যাদা বাড়লেও বাংলাদেশকে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। কারণ, এলডিসি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া কিছু সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। ফলে রপ্তানি নিয়ে শঙ্কা দেখা দেবে, ওষুধ উৎপাদনের খরচ বাড়বে। আরও নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

সিডিপির নিয়ম অনুযায়ী, এলডিসি থেকে বের হতে হলে পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে নির্দিষ্ট মান অর্জন করতে হয়। ২০১৮ সালের পর এবার দ্বিতীয় মূল্যায়নেও নির্দিষ্ট মান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। একটি দেশ এলডিসি থেকে বের হতে পারবে কি না, সেটি ঠিক করা হয় মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিনটি সূচকের ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে অন্তত দুটি সূচকে যোগ্যতা অর্জন কিংবা মাথাপিছু আয় নির্দিষ্ট সীমার দ্বিগুণ করতে হয়।

এবার বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপাল ও লাওসের নামও সুপারিশ করেছে সিডিপি। যোগ্যতা অর্জন করা সত্ত্বেও মিয়ানমার এবং তিমুর লেসেথো সুপারিশ পায়নি।

কী আছি, কী হব

জাতিসংঘ তার সদস্যদেশগুলোকে উন্নয়নশীল ও উন্নত—এই দুটি শ্রেণিতে ভাগ করে। আবার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যারা দুর্বল, তাদের বলা হয় স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি)। এই তালিকা প্রথম করা হয় ১৯৭১ সালে। এলডিসিগুলো যাতে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন ও আর্থসামাজিক মর্যাদা বাড়াতে পারে, সে জন্য শুল্কমুক্ত বাণিজ্য–সুবিধাসহ নানা সুবিধা পায়। বাংলাদেশ অর্ধশতাব্দী ধরে এলডিসি হিসেবে এসব সুবিধা পেয়েছে। ২০২৬ সালের পর সুবিধাগুলো ক্রমান্বয়ে ওঠে যাবে। বাংলাদেশ এখন আছে উগান্ডা, কিরিবাতি, হাইতি, টুভালু, জিবুতি, গিনি, নেপাল, মিয়ানমারের মতো দেশের কাতারে। এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশের কাতারে থাকবে বাংলাদেশ।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বেশি সুদে হলেও ঋণ নিয়ে অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নে অধিক খরচ করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সিগুলোর দেওয়া রেটিং বাড়বে, যা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে।

চ্যালেঞ্জের মুখে যা

এলডিসি থেকে বের হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কারণ, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মতো আঞ্চলিক বা দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে (যেমন ভারত, চীন) যেসব শুল্কমুক্ত বাণিজ্য–সুবিধা পাচ্ছে সেগুলো ২০২৬ সালের পর বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ইইউতে জিএসপির আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা আরও তিন বছর থাকবে।

তখন বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর নিয়মিত হারে শুল্ক বসবে। ডব্লিউটিওর সম্প্রতি প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী নতুন মর্যাদা পাওয়ার পর বাড়তি শুল্কের কারণে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি ৫৩৭ কোটি ডলার বা সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকার মতো কমতে পারে।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, শুল্কমুক্ত সুবিধার কারণেই বাংলাদেশের রপ্তানি খাত বিশেষ করে পোশাকশিল্প আজ এই সুদৃঢ় অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এলডিসি থেকে বের হওয়ার পর পোশাক খাতই সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে এবং চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

সেলিম রায়হান আরও বলেন, এলডিসি থেকে বের হওয়ার পরিস্থিতিতে সার্বিক পরিবেশ উন্নত করতে হবে এবং অবকাঠামো ও মানবসম্পদ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোকে এখন আবিষ্কারক প্রতিষ্ঠানকে মেধাস্বত্বের জন্য অর্থ দিতে হয় না। কারণ, মেধাস্বত্বের (পেটেন্ট) ওপর অর্থ পরিশোধ করা হলে দাম বেড়ে গরিব মানুষের স্বল্প মূল্যে ওষুধ পাওয়ার সুযোগ কমে যাবে। পেটেন্ট সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। তবে এলডিসি থেকে বের হলে সুবিধাটি থাকবে না।

প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে এখন বাংলাদেশ শিল্প ও কৃষি খাতের বিভিন্ন পণ্য বা সেবার ওপর ভর্তুকি দিতে পারে। রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে নগদ সহায়তা দেয়। এসব সুবিধা দেওয়া নিয়ে আপত্তি উঠতে পারে। আবার অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ়—এমন মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া কঠিন হবে।

এ ছাড়া জাতিসংঘে চাঁদার পরিমাণ বাড়বে। ২০২৬ সালের পর আর এলডিসি বিবেচনায় বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তারা জাতিসংঘের বিভিন্ন সভায় যোগ দিতে বিনা পয়সায় বিমান টিকিট পাবেন না। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষাবৃত্তির সংখ্যাও কমে যেতে পারে।