এক ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ও চিকিৎসায় নোবেল পেলেন দুই মার্কিন

সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসায় নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করা হয়। এ সময় স্ক্রিনে বিজয়ীদের ছবি ভেসে উঠে। (বাঁ থেকে) হার্ভি জে অলটার, মাইকেল হটন ও চার্লস এম রাইস

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হেপাটাইটিস সি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যগত অন্যতম বড় সমস্যা। তবে হেপাটাইটিস এ এবং বি শনাক্ত হওয়ার পরও বিজ্ঞানীরা হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের বিষয়ে অনেক দিন অন্ধকারে ছিলেন। অবশেষে মার্কিন বিজ্ঞানী হার্ভি জে অল্টার, চার্লস এম রাইস এবং ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত মাইকেল হফটনের অক্লান্ত চেষ্টায় শনাক্ত হয় প্রাণঘাতী আরেকটি ভাইরাস, যা হেপাটাইটিস সি নামে পরিচিত। তাঁদের অনুসন্ধানের ফলে রক্তবাহিত এই রোগের চিকিৎসাপদ্ধতিও উদ্ভাবন সম্ভব হয়। এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছর এই তিন বিজ্ঞানীকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

এই তিন বিজ্ঞানীর গবেষণাকর্মের ফলে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় ওষুধ দ্রুতগতিতে উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে। গতকাল সোমবার সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী হিসেবে এই তিনজনের নাম ঘোষণা করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী হার্ভি জে অল্টার (৮৫) বর্তমানে দেশটির মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথে কর্মরত। যুক্তরাষ্ট্রেরই আরেক বিজ্ঞানী চার্লস এম রাইস (৬৮) নিউইয়র্কে রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। আর ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত মাইকেল হফটন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টায় কাজ করছেন। এবারের নোবেল পুরস্কারের এক কোটি সুইডিশ ক্রোনার (১১ লাখ মার্কিন ডলার) অর্থ তাঁরা তিনজন সমানভাবে ভাগ করে নেবেন। সাধারণত প্রতিবছর ১০ ডিসেম্বর সুইডেনের স্টকহোমে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মাধ্যমে বিজয়ীদের হাতে নোবেল পুরস্কার হস্তান্তর করা হয়। তবে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এ বছর ওই অনুষ্ঠান বাতিল করেছে কর্তৃপক্ষ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় চার লাখ মানুষের মৃত্যু হয় হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে। নোবেল কমিটি বলছে, এই তিন বিজ্ঞানীর অবদানে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে সৃষ্ট রোগের চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবন সম্ভব হয়েছে, যা এই ভাইরাস নির্মূলে আশার সঞ্চার করেছে।

নোবেল কমিটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, চল্লিশের দশকেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে দুই ধরনের সংক্রামক ভাইরাস হেপাটাইটিসের জন্য দায়ী। প্রথমটির নাম হেপাটাইটিস এ। দূষিত পানি বা খাবারের মাধ্যমে এটি ছড়ায়। অপর ধরনটির নাম হেপাটাইটিস বি। রক্ত ও শারীরিক অন্যান্য তরল পদার্থের মাধ্যমে এটি ছড়ায়। এর সংক্রমণে সিরোসিস ও যকৃতের ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে।

তবে সত্তরের দশকে হার্ভি জে অল্টার ও যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথে তাঁর সহকর্মীরা লক্ষ করলেন, হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা উদ্ভাবিত হওয়ার পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রক্তবাহিত হেপাটাইটিসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু হেপাটাইটিস এ কিংবা বির পরীক্ষায় এসব রোগীর জটিলতা পুরোপুরি চিহ্নিত হচ্ছিল না। আক্রান্ত রোগীদের বেশির ভাগই অন্যের কাছ থেকে রক্তের কোনো না কোনো উপাদান গ্রহণ করেছিলেন (ব্লাড ট্রান্সফিউশন)। অল্টার ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়, ওই রোগীরা আসলে নতুন একধরনের হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়েছেন। রহস্যময় এই রোগটির নাম দেওয়া হয় ‘নন-এ, নন-বি হেপাটাইটিস’। এর এক দশক পর মাইকেল হফটন ও তাঁর সহকর্মীরা নতুন ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্স করেন। সবশেষে চার্লস এম রাইস প্রমাণ করেন, নতুন ভাইরাসটি সম্পূর্ণই আলাদা। এরপর এর নাম দেওয়া হয় হেপাটাইটিস সি। এই ভাইরাসের সংক্রমণেও সিরোসিস ও যকৃতের ক্যানসার হয়।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, নোবেল পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় হার্ভি জে অল্টার সুইডিশ রেডিওকে বলেছেন, ‘আমি চমৎকৃত হয়েছি। এই দিনে যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে, তা তো আমি বুঝতেই পারিনি।’